অন্তরঙ্গ সহবাস- ২, ৩

সজীবের এরকম হাস্যজ্জল চেহারা যেন আপনজনসহ অনেকের কাছে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া নেয়ামত এর মত। এখনকার পৃথিবীতে বাস করা অনেক কঠিন, মায়া দয়া ভালবাসা এগুলো এখন মামুলী(সামান্য) ব্যাপার। এখন মানুষ সামান্য বিষয় নিয়ে মানুষ মানুষের সাথে যেরকম আচরণ করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তা বলা বাহুল্য। লোভ লালসা মানুষকে এখন আর মানুষ রাখেনি আজব প্রাণী বানায় ফেলছে। সজীব ছিল সাদাসিধা সহজ মানুষ, তার সাথে কেউ দোষ করে, আবার তাকেই সালা বলে গালি দিয়ে চলে গেলেও সে তার কোন উত্তর দিত না। তার এই সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই বড়ো বড়ো ক্ষতি করে চলে গেছে।

এই পৃথিবীতে ভালো মানুষের সুযোগ নিয়ে একটা পাগলও তার ফায়দা উঠাতে কার্পণ্য করে না সজীব সব বুঝতে পারে, কে কি করে? কিভাবে ফায়দা উঠালো? তারপরও সে তার কোন প্রতিত্তোরে কিছুই বলে না। তার মলিন মুখটায় হাসি যেন অমুল্য রত্ন। জীবনের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে বেঁচে আছে সজীব। সেই ছোটবেলা থেকে একের পর এক ঘটনা সজীবের জীবনের সতেজতা কেড়ে নেয়।

পারিবারিক দিক দিয়ে খুবই গরীব অর্থাৎ নিম্ন মধ্যবিত্তের নিচে যদি কোন শ্রেণিবিন্যাস থাকতো জীবন যাপনের জন্য তাহলে সেটা তার পরিবার। এতোটাই গরীব ছিল, আগেই বলেছি এই এলাকা নদীমাতৃক প্রায় ছোট বড় তেরটি নদী বয়ে গেছে সজীবের এলাকার আশপাশ দিয়ে। এই কারনে প্রতিবছরই বন্যা হয়, যে বছর বন্যা বেশি হয় সেই বছর ধানক্ষেত খামার দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকার কারনে নষ্ট হয়ে যায়।

এই এলাকায়, নদী ভাঙন বন্যা এই এলাকার মানুষের জীবন দূর্বিষহ করে তুলেছে। মায়ের মুখে শোনা, ৯৪ এর বন্যায় জন্ম হয় সজীবের। অভাবের সংসারে আরও এক ছেলের জন্ম সজীবের এক বড় ভাই আছে। বাবা সংসার চালানোর জন্য ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম কখনো বা সিলেট যায় প্যাডেল রিকশা চালানোর জন্য জীবিকা নির্বাহ করার জন্য, সংসার চালানোর জন্য। দুই তিনমাস কাজ করে আবার বাসায় আসতো, সজীবের পরিবার চলতো তার বাবার ইনকাম কার টাকায়, বাবা টাকা পাঠালে খাবার জুটতো না হলে জুটতো না।

বাবা যে টাকা পাঠাতো তাতে এক মাসের বা পনের দিনের চাল কিনার টাকা হতো, মা নিজ হাতে নিজ বুদ্ধিতে সংসার চালাতো। সে সময় মা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটা গরু কিনেছিল। সংসার, সাপ্তাহিক কিস্তিতে ক্ষুদ্রঋণ, মায়ের জন্য সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। সজীব তখন চার থেকে পাঁচ বছর বয়সের, আর সজীবের বড়ভাই তখন আট থেকে দশ বছর হবে, মায়ের পেটে তখন সজীবের ছোট ভাই বড় হচ্ছে।

সেই সময়কার কথা সজীবের বাবা কুমিল্লা গেছে, কয়েকদিন ধরে কোন রকম খোঁজ খবর ছিল না এদিকে সজীবের বাড়িতে কোন খাবার দাবার এর ব্যবস্থা নেই, দুই তিন দিন পাড়া প্রতিবেশীর কাছে চাউল ধার করে নিয়ে এসে, জাউ ভাত রান্না করে দিত মা।

একদিন সকাল বেলা খাবার পর দুপুর রাতে খাবার জোটেনা সজীবের পরিবারের কারওই, সজীব কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে যায়, পরের দিন সকালে মা দুই ভাইকে নিয়ে নানা বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দেয়। সজীবের বাড়ি নানার বাড়ি সাত আট মাইল দূরে।

মা অসুস্থ হওয়ায় সজীব কে কোলে নিতে পারতো না, বড় ভাই ছিল টিংটিঙে রোগাক্রান্ত চেহারার, আর সজীব ছিল সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নাদুসনুদুস, বড় ভাই সজীবকে পিঠে নিয়ে হেঁটে রওনা হয়। সজীব নাদুসনুদুস হওয়ায় পিঠে নিতে খুব কষ্ট হতো, আবার তাকে পিঠে নিয়ে হেঁটে যাওয়া, হাঁটতে হাঁটতে একসময় দই পা জটলা পাকিয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যেত দুই ভাই।

একি তো দুই দিন হতে চলে খাবার যায় না দুই ভাইয়ের পেটে, এভাবেই রাস্তায় কত বার যে পড়ে যেত দুই ভাই, আর কিছু দুর করে গিয়ে মানুষের বাসা থেকে পানি চেয়ে নিয়ে দুই ভাইকে খাওয়াইতো আর পেট ভরাইতো মা যাতে করে দুই ভাইয়ের কষ্ট কম হয়। এই জন্যই হয়তো সন্তানের সকল প্রকার রোগ ব্যাধি, অশান্তির মহা ঔষধ হলো মা।

 

মা হলো সজীবের সকল রোগের মহা ঔষধ। সজীবের একটু মন খারাপ হলে মাকে ফোন দেয়। মায়ের কন্ঠ শুনলেই নিমিষেই মন খারাপ ভালো হয়ে যায়। মায়ের কন্ঠ যেন যাদু মন্ত্রের মত কাজ করে। সজীব চাকরি ও পড়াশোনা করার জন্য ঢাকা শহরে থাকে।

পরবর্তীতে মা আমাদের কে নিয়ে নানা বাড়িতে চলে আসে। রান্না করে আমাদের দুই ভাইকে খাওয়ায়।

তারপর দুই তিন আমরা নানা বাড়িতেই থাকতাম।  নানা কয়েক দিনের খাবার কিনে দিয়ে আমাদেরকে বাড়িতে রেখে যেত।  আমার নানারও তেমন আত্মিক- অবস্থা (অর্থ সম্পদ) ভালো ছিলো না। দিন আনি দিন খেত, তারপরও অনেক ভালো চলতো তার সংসার।

 

তারপর কয়েকদিন পরে বাবা বিদেশ (বিদেশ বলতে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া) থেকে টাকা পাঠাতো হুন্ডির মাধ্যমে।

সেসময় যোগাযোগ করার জন্য কোন কিছুই ছিলোনা । এখন যে রকম মোবাইল আছে মহূর্তের খবর হাতের মুঠোয় পাওয়া যায় ।  মন চাইলে কথা বলা যায়,  মন চাইলে ভিডিও কলে কথা বলা যায়।  তখন এ রকম কিছুই ছিল না।  যদিও তখন টেলিফোন আবিষ্কার হয়েছিল।  তা বড় বড় দালানকোঠার বড়লোকের বাসায় থাকতো।  গ্রামে এসব কিছুর কোন প্রচলন ছিলো না।  হুন্ডি টা হতো মানুষের মাধ্যমে টাকা পাঠানো।  অথ্যাৎ গ্রামের কেউ বাড়িতে আসলে তার হাতেই টাকা পাঠানো।

 

তার কিছুদিন পর বাবা বাড়িতে আসে। বাবা বাড়িতে আসলে কাপড়-চোপড়, বিস্কিট, ফল নিয়ে আসতো। দুদিন রেস্ট নিয়ে দেশেও রিকশা চালাতো বাবা।  আসলে বাবারা এমনি হয়।  সংসার নামের ঘানি টানতে টানতে জীবন শেষ হয়ে যায়। তারপর আবার কিছু দিন পর বাবা আবার কাজে যায় শহরে।  আমাদের এক থেকে দেড় মাসের খাবার মজুদ করে দিয়ে যায় যাতে কোন অসুবিধা না।

মাঝে মধ্যে নানা বাজার করে নিয়ে আসতো,  বড় বড় ইলিশ মাছ নিয়ে আসতো, কৌটার মাছ নিয়ে আসতো। কৌটার মাছ বলতে সেসময় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এ মাছ দেওয়া হত।  এর স্বাধ যেন এখনো মুখে লেগে আছে।  আর ইলিশ মাছের স্বাধের কথা বাদই দিলাম, সবাই জানে,  এই মাছ স্বাধে অতুলনীয়।  এভাবে কিছুদিন চলে যায়।  ভালোই চলছিল সংসার অথ্যাৎ কখনো না খেয়ে থাকতে হয় না।

 

কিন্তু এই সামান্য সুখটুকুও বেশিদিন স্থায়িত্ব পায় না।  আমার বয়স তখন চার থকেক পাঁচ বছর। হঠাৎ করে নেমে আসে বিভিষীকাময় এক সন্ধ্যা। কালো অন্ধকারে ঢেকে যায় আকাশ বাতাস, বাড়ির চারপাশ। সন্ধ্যা নামছে, মা ভাতের পাতিল চুলায় উঠায় দিয়ে, তরকারি কেটে রেডি করে রাখে।  এদিকে ভাতের পাতিল টকবক করে ফ্যান উতলে পড়া শুরু করে পাতিলের চতুর্দিকে।  মা তরকারি রান্নার জন্য সব রেডি, দেখে বাড়িতে লবন নাই।

মা আমাদের দুই ভাইকে রান্নাঘরে রেখে, একশো গজ দুরে চাচার বাড়ি থেকে লবন ধার কারার জন্য যায়। বড় ভাই চুলার পাশে বসে আগুন দেখে চুলা থেকে বাহিরে আসে কিনা।  আমি মেঝতে খেলছিলাম,  হঠাৎ শোবার ঘর যেটাকে আমরা বলি বড়ঘর ঘরে ও রান্নাঘরে আগুন।  বড়ভাই  আমাকে কোলে করে নিয়ে কিছুদূরে সুপারিবাগানে চলে আসে।  চতুর্দিক চিল্লাচিল্লি শুরু হয় আগুন আগুন বলে।

 

গ্রামের সবাই চলে আসে আগুন নিভাতে।  কিন্তু মহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবকটি ঘরে। রান্নাঘর ছিলো উপরে ছন, বেড়া পাটখড়ির,  বাকি ঘরগুলোতে উপরে গমের ছন, বেড়া ছিলো বাঁশের হাদলা ও পাটখড়ি দিয়ে।  মহূর্তে দুই ঘরের আগুন ছড়িয়ে পরে পুরো ঘরে,  পাশের ঘরকে বাদ রাখেনি আগুন। গ্রামবাসী আগুন নিভানোর অনেক চেষ্টা করে কিন্তু পারে না যতই আগুনে পানি ছিটায় আগুল তত দাউদাউ করে করে জ্বলে উঠে। নিমিষেই পুরো বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘর থেকে শুধু অর্ধপোড়া কাপড়, কিছু দলিল দস্তাবেজ ছিলো যার বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেছে, উপরের দিকে কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে। যা থাকা না থাকা সমান কথা, এই দলিলের কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

দুটি ঘরে একসাথে আগুন কিভাবে লাগলো গ্রামবাসি বলাবলি করছিল। এর উত্তর অজানা। বাবা তখন শহরে রিকশা চালাতে গেছে আসতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে হয়তো।  বিভৎস সেই কালো রাত কেটে গেছে  মা ভাই আর আমার  না খেয়ে অনাহারে ঘরপোড়া সেই ছাই গায়ে মেখে আহাজারি করতে করতে।  মা মাটি চাপড়িয়ে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করে রাত পার করেছে। গ্রামবাসী আস্ফালন করতে করতে বলে কে এমন ক্ষতি করলো এই পরিবারের।  এখন এরা যাবে কই, থাকবে কই, খাবে কি? এভাবে দুদিন চলে যায়।  কেমন করে জানি বাবা খবর পায়,  বাবাও চলে আসে দুদিনের মাথায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts