অন্তরঙ্গ সহবাস-১

সিলেট পূর্ণভূমি নামে খ্যাত।  চায়ের দেশে অফিসের কাজ শেষে কলিগদের সাথে চা বাগানে ঘুরতে গেছে সজীব। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিকেলের উষ্ণ অভ্যর্থনায় কচি চা পাতার সজীবতায় নিমিষেই ক্লান্তি দুর হয় সজীবের। সজীবের কলিগরা সমবয়সী হওয়ায় বন্ধুর মত সবাই। চা বাগানের সরু পথ ধরে সবাই মিলে চিলের মত ডানা মেলে দেয় ভোঁ-দৌড়, কানামাছি আরও খেলায় মেতে উঠে সবাই। তারপর দিনের আলো নিভে গেলে সবাই মিলে রেস্ট  হাউজে ফিরে। রেস্ট হাউজটা জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের।

সজীব হাত মুখ ধুয়ে মুছে ফ্রেশ হয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছনায় শুয়ে শুয়ে চালাচ্ছে, আর সারাদিন কে কি ম্যাসেজ করছে তা মেসেঞ্জার এ চেক করে। তারপর ফেসবুকে ঢুকে দেখে অনেক গুলো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গুলো একসেপ্ট করতে  করতে হঠাৎ করে একটা রিকোয়েস্ট চলে আসে। নাম তার তুলি। তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করতেই, মেসেজ আসে “হায়” সজীব রিপ্লেতে ধন্যবাদ জানায়। তুলি বলে ধন্যবাদ কেন? সজীব বলে এটা আমার অভ্যাস,  নতুন যদি কেউ বন্ধু হয় আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই, ওহ ভালো।

তারপর থেকে মেসেজে দুজনের কথা হতে থাকে। এক সময় সজীব বিরক্ত হয়ে যায়, মেসেজ টাইপ করা সজীবের জন্য খুবই বিরক্তিকর। সজীব তুলি কে বলে আমি মেসেজ এ খুব কম কথা  বলি। সারাদিন কাজ করার পর  মেসেজ টাইপ করা খুবই  বিরক্তি লাগে,  তখন তুলি বলে ঠিক আছে  তাহলে আপনি হোয়াটসঅ্যাপ এ কথা বলতে পারেন,  আচ্ছা আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার দেন। তারপর তুলি হোয়াটসঅ্যাপ এ ফোন দেয়,  তুলি সজীব কে জিজ্ঞেস করে কি করেন আপনি? আমি একটি কনসালটেন্ট  ফার্ম এ আছি।

সিলেটে একটি প্রজেক্ট এর কাজে আসছি, ঢাকা টু তামাবিল রোডের ফোর লেন এ উন্নীতকরণ প্রকল্পের  ফিজিবিলিটি চেক করতে আসছি।  ও আচ্ছা,  আপনি কি ঢাকাতেই থাকেন? হুম। দেশের বাড়ি কই আপনার? কুড়িগ্রাম। ঔ দিক তুলি মৃদু স্বরে উত্তর দেয় কি? আপনার বাসা কুড়িগ্রাম।  অনেক আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করে কুড়িগ্রাম এর কোথায় বাসা আপনার কোন উপজেলায়?  সজীব বলে, নাগেশ্বরী উপজেলা, কেন বলুন তো, আপনি এতো আগ্রহের সাথে জানতে চাচ্ছেন।

তুলি বলে না কিছু  না এমনিতেই। সজীব বলে কেন, আপনার বাসা কি ওখানেই, তুলি বলে না, আমার বাসা জামালপুর, আমি কুড়িগ্রাম এর উলিপুর উপজেলায় একটা প্রজেক্ট এর সুপারভাইজার হিসেবে আছি। ও আচ্ছা  তাই বলেন। সজীব বলে তো কেমন লাগতেছে আমাদের এলাকা। তুলি বলে অনেক সুন্দর আমার খুব খুব ভালো লেগেছে, এদিকের মানুষ গুলো  অনেক সাদাসিধা, অতিথিপ্রিয়।

 

এখানকার নদী মাতৃক প্রকৃতির রূপ এক কথায় অমায়িক। তুলির কথা শুনে সজীবের বুক গর্বে ভরে উঠে। তারপর থেকে তুলির সাথে চলতে থাকে কথা, পরের দিন আবার সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে, ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে কাজে যোগ দেয় সজীব। কাজের ফাঁকে টুকটাক কথা হত তুলির সাথে, কাজ শেষ হলে বাসায় ফিরে রীতিমতো মোবাইল হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পরে সজীব, একটু মোবাইল চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে যাবে।

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় গেলে মনে হয় স্বর্গের সুখ পেয়েছি। ছড়ার সম্রাট জগলুল হায়দার বলেন, “লক্ষ টাকার খাট কেনা যায় ঘুম কেনা যায়, যায় কি বলো?” ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে সজীবের। ঠিক তখনি ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটা মেসেজ চলে আসে, আপনার ফোন নাম্বার দেওয়া যাবে। এতোদিন ফেসবুকের মেসেজেই কথা হতো, সজীব ফোন নাম্বার দেয়, তুলি জিজ্ঞেস করে আমি কি আপনাকে ফোন দিতে পারি।

কোন কিছু না ভেবে সজীব উত্তর দেয় হ্যা অবশ্যই। তুলির ফোন চলে আসে হোয়াটসঅ্যাপ এ। তারপর থেকে তাদের মধ্যে অনর্গল কথা হয়। মনের না বলা কথা গুলো মনের ভিতর গৃহযুদ্ধ শুরু করে দিছে তবুও কেউ কাউকে বলতে পারছে না ভালবাসার কথা, তোমাকে মনে লেগেছে, তুমি দাগকেটেছো মনে, কেউ কাউকে বলতে পারছে না। কথা চলতে থাকে অনর্গল, মনে হয় পৃথিবীর যত ভাষা আছে,  সব ভাষার যত শব্দ আছে সব শেষ হয়ে যাবে তবু কথা শেষ হবেনা।

এ যে মনের কথা, কখনো শেষ হবার নয়। তুলির সাথে কথা বলে ভালোই লাগতো সজীবের, জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গেছে সজীব এর জীবন থেকে, কেমন যেন এক ঘেয়ামী, কালো মুখটা যেন আরও অন্ধকার করে রাখতো সজীব। তুলি আসাতে জীবনের  প্রাণ ভোমরা ফিরে পেল সজীব, আবার সেই সহজাত স্বভাবে ফিরে গেলো সজীব।

সজীব সবসময় সদাহাস্যজ্বল, প্রাণবন্ত ও আড্ডা প্রিয় থাকতো, মুখটা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখাতে কত জনের কত কথা শুনতে হত তা বলার বাহিরে। তুলি যেন আলো নিয়ে আসে সজীবের জীবনে। সজীবের এ রকম হাস্যজ্বল মুখ দেখে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশি, এমনকি অফিসের  কলিগরাও অনেক খুশি হয়। সজীবের এ রকম হওয়ার পিছনে একজনই দায়ী ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts