দীর্ঘ আলোচনা সমালোচনা পর ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি রাতে থমথমে ভীতিকর পরিবেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। পরবর্তীতে লাজুক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গঠন করার জন্য শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুস কে তিন বাহিনীর প্রধানগণ অনুরোধ জানালে, ড. মোহাম্মদ ইউনুস প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, বলেন আমি যেভাবে দেশ পরিচালনা করতে চাই, সেই ভাবে এই সময়ে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব না।
পরবর্তীতে তিনি দেশের অস্থিতিশীল পরিবেশে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিতে আসতে চাইলে দেশের সামগ্রিক পরিবেশে তা আর হয়ে উঠে নি। তখন ড.মোহাম্মদ ইউনুস বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের তোপের মুখে পরেন এবং তাদের শত্রু হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে রাজনীতি পিছু ছাড়লেও রাজনৈতিক শত্রু পিছু ছাড়েনি তার।
প্রফেসর ড.মোহাম্মদ ইউনুস তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে অস্বীকৃতি জানালে তৎকালীন তিন বাহিনী ও সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ নিজেই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ’ওয়ান—ইলেভেন’ বা এক—এগারো (১/১১) নামে আখ্যায়িত করেন। অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১১ই জানুয়ারী ভৌতিক রাত পেরিয়ে ১২ই জানুয়ারি বাংলাদেশ দেখে নতুন সকাল। শুরু হয় অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও সেনার যৌথ শাসন। পরিবর্তন শুরু হয় সব ক্ষেত্রে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদ কঠোর অবস্থান নেয় অন্যায়, দূর্নীতি, ঘুষখোর দের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন রকম আন্দোলন, জ্বালাও পুড়াও করে দেশ যখন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পড়ে তখন পুঁজিবাজার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে । সরকার তখন সব ধরনের আন্দোলন মিছিল মিটিং বন্ধ ঘোষণা করে। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সাধারণ মানুষ ঘরমুখো হয়ে যায়, নীরব নিস্তব্ধতায় চাপা পড়ে দেশ।
গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমদ সরকার দেশের দায়িত্বভার নেওয়ার পর মানুষ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল, তার রাস্তায় বের হলে প্রাণ হাতে নিয়ে বের হতে হয়েছিল। কারণ সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ ও তাদের আশ্রিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এতোটাই ক্ষমতার ধূম্রজাল তৈরি করেছিল যে, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের যেখানেই মানুষ বাড়ি তৈরির কাজে হাত দিতো, নতুন ব্যবসার কাজে হাত দিতো, জমি কেনা বেচা করতো সেখানেই স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও তাদের আশ্রিত সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হতো। বাজার, ঘাট, বালুমহল, কলকারখানা, পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন রকম হারে মাসিক চাঁদা আদায় করতো এই সব রাজনৈতিক ব্যক্তি ।
পরিবহন সেক্টরও চলে অবাধ লুটপাট চাঁদাবাজি। সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকে এসব রাজনৈতিক ব্যক্তিবগের্র নিকট। চাঁদা না দিলে গুলি করে, গুম করে, কিংবা টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে দিতো নদীতে, জঙ্গলে, কিংবা কুমিরকে খাওয়াতো। এই সব কর্মকান্ডে বেশি প্রভাব বিস্তার করতো আওয়ামী লীগ তারপর বিএনপি।
কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের সরকার দায়িত্বভার নেয়ার পর দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন রকম যৌথ অভিযান পরিচালনা করা শুরু করে। ঐ সময় আওয়ামী লীগ খুব সরব ছিল মাঠে এবং তাদের দাবি ছিল, এই ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কে তারা বসিয়েছিল ক্ষমতায়। যৌথ অভিযান শুরু হলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের ধরাওপাকড় ও শুরু করলে এই দুই দল সহ সব রাজনীতিবিদ ও তাদের আশ্রিত সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে চলে যায়।
যৌথ অভিযানে প্রথমে দুই দলের প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কে গ্রেফতার করা হয়। খালেদা জিয়ার দুই সন্তান তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। তৎকালীন সেনা প্রধান চেয়েছিলেন প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতাকে বাহিরে রেখে নিবার্চন করা। এর জন্য তিনি আপ্যায়ন চেষ্টা করে গেছে।
তাইতো এই সময়কালকে ”মাইনাস টু ফর্মুলা” বলা হয়ে থাকে। দুই দলে বড়বড় নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে অভিযান শুরু হলে, সব রাজনৈতিক নেতা কর্মী ও তাদের আশ্রিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আত্মগোপনে চলে যায়। শান্তির এক বাংলাদেশ দেখতে পায় বাংলার মানুষ, স্বস্থির এক বাংলাদেশ।
তখন অনেকেই চাঁদা না দিয়ে নির্ভয়ে রাড়ি করেছেন। রাজপথেও নেমে এসেছিলো স্বস্তি। কোটি টাকা দামের গাড়ীর মালিকরা তাদের গাড়ি লুকিয়ে ফেলেছেন। তাছাড়া মেয়াদ উত্তীর্ণ গাড়ি রাজপথে নামান নি রাজনৈতিক শেল্টারে থাকা গাড়ির মালিকরা।
গ্রেফতার আতঙ্কে কেউ কেউ টাকা ফেলে দিয়েছেন রাস্তায়, অলি—গলিতে। কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে কুমিরকে খাওয়াতেন। রাস্তায় পার্কিংয়ের বদলে বহুতল ভবনের নীচ তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য সরকার নির্দেশ দিলে ভবনের মালিকরা ভবনের নীচতলা ভেঙ্গে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার কাজ শুরু করেন। মোটামুটি সকল সেক্টরে শৃঙ্খলা চলে আসে। ওয়ান—ইলেভেনে শুধু রাজনীতিবিদরাই আতঙ্কে ছিলেন না। আতঙ্কে ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীরা। ঘুষ, দুর্নীতি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ড. ফকরুদ্দিন এর সময়কালে জনজীবনে স্বস্তি নিয়ে এলেও পরে জনজীবনে দূর্বিষহ নেমে আসে। পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। নিত্য প্রয়োজনীয় তরিতরকারির দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার বিরুদ্ধে বাগ বিতন্ডা শুরু করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। বাজার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য যৌথবাহিনীর সদস্যরা জিনিসপত্রের দাম কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন করেন নি । বরং ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। নেপথ্যে ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী যারা বিভিন্ন ব্যবসার সাথে জড়িত। ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুদ করে বাজার অস্থির করে, পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন।
বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের গুদামে অভিযান চালাতে শুরু করে সেনাবাহিনী। এতে ব্যবসায়িরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে যায় এবং নিত্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আড়দে পঁচিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। বাজারজাত করা বন্ধ করে দেন। সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। এতে দেশে নিত্য পণ্যের সঙ্কট তৈরি হয়। চতুর্মুখী সংকটে পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। প্রশ্নবিদ্ধ হয় তত্ত্ববধায়ক সরকার, উপদেষ্টাদের নামে বিভিন্ন অনিয়ম এর অভিযোগ উঠে। অভিযান এ অংশ নেওয়া বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সমাজ। পরবর্তীতে সব রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা আন্দোলন করতে থাকে।
একপর্যায়ে ২৩ আগস্ট ২০০৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তুচ্ছঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্র—সেনা সদস্যদের সংঘষের্র ঘটনা ঘটে। ছাত্র সমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং তাদের সাথে সর্বদলীয় ছাত্র সংসদ, সাধারণ মানুষ যোগ দেয়। সেনা শাসন থেকে দেশ মুক্ত করতে। ধীরে ধীরে আন্দোলন আরও বেগবান হয়, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হলে।
এদিকে আওয়ামী ও তার সমর্থিত অঙ্গ রাজনৈতিক দল বিভিন্ন রকম অপ্রীতিকর হামলা, ছিনতাই, রাহাজানি শুরু করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এবং রাজনীতির নামে নোংরা অপরাজনীতি শুরু করে । সে সময় তারা নীরিহ মানুষের উপর অত্যাচার শুরু করে। লগি বৈঠার আন্দোলনের নামে শতশত মানুষ খুন করে।
পরবর্তীতে এই আন্দোলন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পতনের রুপ নেয়। জোরপূর্বক বাধ্য করায় নির্বাচন দেওয়ার জন্য। অবশেষে ২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর ড. ফখরুদ্দিন এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করায় দিয়ে বিদায় নেয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সম্পৃক্ত ১৪ দল সহ সরকার গঠন করে। যৌথ বাহিনী ও সেনা সমর্থিত ড. ফখরুদ্দিন সরকার দীর্ঘ সময় ধরে জারি রাখা জরুরি অবস্থা ১৬ই ডিসেম্বর ২০০৮ সালে অবসান ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে জরুরি অবস্থা চলতে থাকার কারনে, ইতিহাসে এর গুরুত্ব একটু বেশী।
সুত্র: ইন্টারনেট ও বিভিন্ন পত্রিকা।
লেখক: ফারুক ফরায়েজি।


